পড়াশোনা

দারিদ্র্যকে জয় করে মেডিকেল স্বপ্ন পূরণ: এক অনুপ্রেরণার গল্প

By Zahid - Feb 02, 2025
দারিদ্র্যকে জয় করে মেডিকেল স্বপ্ন পূরণ: এক অনুপ্রেরণার গল্প

দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বপ্ন পূরণ করা এক শিক্ষার্থীর গল্প আমাদের শেখায় যে পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। এই শিক্ষার্থী টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, সংকল্প ও আত্মবিশ্বাস থাকলে প্রতিকূলতাও পরাজিত হতে বাধ্য।

সংগ্রামের শুরু: দারিদ্র্যের সাথে যুদ্ধ

এই শিক্ষার্থীর পরিবার নিম্ন-মধ্যবিত্ত, যেখানে প্রতিদিনের জীবনযাপন ছিল কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। তার মা একজন অসুস্থ মহিলা, যার গলব্লাডার অপারেশন হয়েছে। তবুও, তিনি শারীরিক দুর্বলতা উপেক্ষা করে পরিবারের জন্য পরিশ্রম করে গেছেন। শীত সহ্য করতে না পারলেও, সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে রাতের গভীরেও গরুর জন্য ঘাস কাটতে যেতেন। অন্যদিকে, বাবা সীমিত আয়ের মধ্যে থেকেও সন্তানের স্বপ্ন পূরণের জন্য নিজের সাধ্যমতো চেষ্টা করে গেছেন।


তবে দারিদ্র্যের কারণে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বাস্তবায়ন সহজ ছিল না। শিক্ষার্থী যখন প্রথমবার মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়, তখন সে সফল হতে পারেনি। এই ব্যর্থতা তাকে মানসিকভাবে দুর্বল করে তুললেও সে হাল ছাড়েনি। দ্বিতীয়বার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি বিভাগে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে থাকে, কিন্তু তার লক্ষ্য ছিল মেডিকেলে পড়া। তাই সে আবার কঠোর পরিশ্রম শুরু করে।


১৬ ঘণ্টা পড়াশোনা আর অক্লান্ত চেষ্টা

এই শিক্ষার্থী তার লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য প্রতিদিন গড়ে ১৬ ঘণ্টা পড়াশোনা করত। প্রতিটি মুহূর্ত তার জন্য ছিল একটি নতুন চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন আর্থিক সীমাবদ্ধতা, মানসিক চাপ এবং সামাজিক প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও সে দমে যায়নি।


অবশেষে, তার নিরলস প্রচেষ্টা সফল হয়। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সে শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ, টাঙ্গাইল-এ সুযোগ পায়। ভর্তি পরীক্ষায় তার মোট স্কোর ছিল ৭৩, যদিও ৫ নম্বর কর্তনের কারণে তার র‍্যাঙ্ক কিছুটা পিছিয়ে যায়। তবুও, এই সাফল্য তার কঠোর পরিশ্রমের স্বীকৃতি।


ভর্তির জন্য বিশাল অঙ্কের টাকা ও নতুন চ্যালেঞ্জ

মেডিকেলে ভর্তি হতে তার বিশ লাখ টাকা প্রয়োজন, যা তার পরিবারের কাছে নেই। যদিও তার বাবা ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাকে সাহায্য করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তবুও এই চ্যালেঞ্জ সহজ নয়। শিক্ষার্থীর বাবা সাহায্যের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, এবং আশ্বাস পেয়েছেন যে যথাযথ সহযোগিতা পাবেন।


এমন সময়, একজন শিক্ষক পাশে এসে দাঁড়ান, যিনি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীকে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং সবসময় তার পাশে ছিলেন। তিনি অনুপ্রেরণা দেন এবং আশ্বাস দেন যে টাকার জন্য চিন্তা না করে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হবে। তার মতে, শিক্ষার্থী যদি কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে মাইগ্রেশন নিতে চায়, তাও যেন সে নির্ভয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। শুভাকাঙ্ক্ষীরা সবসময় পাশে থাকবে।


একটি উদাহরণ ও অনুপ্রেরণা

এই শিক্ষার্থীর গল্প কেবলমাত্র তার ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়, বরং এটি সকল সংগ্রামী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য একটি শিক্ষা। সমাজে অনেকেই দারিদ্র্যের কারণে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করতে পারে না। তবে যদি কেউ সংকল্পবদ্ধ হয় এবং কঠোর পরিশ্রম করতে প্রস্তুত থাকে, তাহলে কোনো বাধাই তাকে থামাতে পারবে না।


এই শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে একজন সফল ডাক্তার হয়ে মানবসেবায় আত্মনিয়োগ করতে চায়। তার সংগ্রাম, অধ্যবসায়, এবং পারিবারিক ত্যাগ আমাদের শেখায় যে সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও যদি কেউ নিজেকে এগিয়ে নিতে চায়, তাহলে সে সফল হবেই।


উপসংহার

এই গল্প আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস এবং উপযুক্ত দিকনির্দেশনা থাকলে সব ধরনের প্রতিকূলতা পরাজিত করা সম্ভব। যারা হতাশার কারণে থেমে যায়, তাদের উচিত এই শিক্ষার্থীর গল্প থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া। জীবন কখনোই সহজ নয়, কিন্তু কঠোর পরিশ্রম কখনো বৃথা যায় না। এই শিক্ষার্থী তার প্রচেষ্টার মাধ্যমে সেটাই প্রমাণ করেছে।


দোয়া ও শুভকামনা

আমরা সবাই তার জন্য দোয়া করি, সে যেন একজন ভালো ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করতে পারে এবং তার পরিবারকে গর্বিত করতে পারে। সেই সাথে, তার বাবা-মায়ের জন্যও দোয়া রইল, যারা সীমাহীন ত্যাগ স্বীকার করে এই সাফল্যের পথ তৈরি করেছেন। এই গল্প যেন আরও অনেক শিক্ষার্থীর জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।